সমকামিতা শব্দটি শুনলেই কেমন যেন অবচেতনভাবেই মানুষের মাঝে একটা বিরুক্তিবোধ কিংবা ঘৃণা চলে আসে। কারো কারো মনে চলে হাসি ঠাট্টা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার চিন্তা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মত ধর্মীয় রক্ষণশীল দেশে সমকামিতা নিয়ে চিন্তা করাটাও অনেক বড় দূরুহ ব্যাপার। হবেই বা না কেন? বাংলাদেশের মানুষগুলো সমকামিতার বিষয়গুলো সম্পর্কে তেমন অবগত নয়। সমকামিতা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জ্ঞানের পরিধিও সীমাবদ্ধ। অধিকাংশই ধর্মীয় বাধার কারণে এই প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষগুলোকে নিয়ে জানার আগ্রহও প্রকাশ করে না। যারাই করতে যায় তাদের ধর্মহীন বলে পরিচয় দিয়ে ফেলে এদেশের ধর্মান্ধ মানুষগুলো। যার কারণে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার আড়ালেই এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীটির প্রতি মানুষের অবচেতন ঘৃণা বহমান রয়ে যায়৷ সমকামিতা নিয়ে মানুষের ভ্রান্তিকর জ্ঞানের জন্যই, এই প্রাকৃতিক বিষয়টাকে বিকৃত যৌন স্বভাব বলে মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে রয়ে যায়৷
সমকামিতা বা হোমোসেক্সুয়ালিটি বলতে সমলিঙ্গ বা একই লিঙ্গের মানুষের প্রতি যৌন আচরণ বা যৌন আকর্ষণ কে বোঝায়। সমকামিতা বলতে অনেকেই শুধুমাত্র যৌন প্রবৃত্তিকেই মনে করে থাকে। কিন্তু সমকামিতা শুধুমাত্র যৌন প্রবৃত্তি বা যৌন আকর্ষণ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসারে যেভাবে একজন পুরুষ একজন নারীর প্রতি এবং একজন নারী একজন পুরুষের প্রতি যৌন আকর্ষণের পাশাপাশি স্নেহ, ভালোবাসা,প্রণয় এবং আবেগ অনুভূতির কাজ করে ঠিক তদ্রূপ সমলিঙ্গের কোন ব্যক্তির প্রতি অন্য সমলিঙ্গের ব্যক্তির জেগে ওঠা যৌন আকর্ষণ স্নেহ কিংবা প্রনয়ের এক স্বাভাবিক প্রবণতাই হচ্ছে সমকামিতা। এছাড়া এর দ্বারা সমলিঙ্গের মানুষের প্রতি যৌন আকর্ষণের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ব্যক্তি কিংবা সম্প্রদায়ের সদস্যদেরও নির্দেশ করা হয়। সহজ বাংলায় সমকামিতা হলো সমলিঙ্গের প্রতি আরেকটা ছেলের যৌন আকর্ষণ এবং একটা মেয়ের প্রতি আরেকটা মেয়ের যৌন আচরণ।
এক্ষেত্রে পুরুষ এবং মহিলা সমকামীদের বোঝাতে আলাদা দুটি শব্দ প্রয়োগ দেখা যায়। পুরুষ সমকামীদের বলা হয় গে এবং নারী সমকামীদের বলা হয় লেসবিয়ান।
প্রায় প্রতিটি সমাজেই সমকামীদের খারাপ চোখে দেখা হয়। এমনকি তাদের সভ্য সমাজের অংশ হিসেবেও অস্বীকার করতে দেখা যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ধর্মীয় রক্ষণশীল দেশে সমকামীদের অধিকার নিয়ে চিন্তাভাবনা করাটাও অনেকটা দুরূহ ব্যাপার।পারিবারিক অসহযোগীতা, সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, নিরাপত্তাহীনতা, ধর্মীয় কঠোর বিধি-নিষেধ, ধর্মীয় উগ্র জঙ্গী গোষ্ঠীর হুমকি, রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া ৩৭৭ ধারার মতো আইন এই সকল কিছুর ভয়ে এই দেশের সমকামীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন, আত্মগোপনে রাখতে হচ্ছে নিজেদের যৌন পরিচয়। অত্যাচার-নিপীড়নের ভয়ে এদেশের সমকামীরা তাদের যৌন পরিচয় লুকিয়ে রাখেন নিজেদের ভিতরেই। যদি কোনো ভাবে কোনো সমকামীর যৌন পরিচয় আত্ম প্রকাশ পায় তাহলে তাকে নানা অত্যাচার-নিপীড়ন এবং বঞ্চনার শিকার হতে হয়৷ এই সকল অত্যাচার ও নিপীড়নের শিকার হয়েই এদেশের অনেক সমকামী বেছে নিয়েছে আত্মহত্যার মত পথ কিংবা কেউ প্রাণ হারিয়েছে কোন উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী জঙ্গিদের হাতে।
৩৭৭ ধারাঃ
ব্রিটিশ ঔপনিবেশ আমলের ( ১৮৬০ সালের) একটি ভারতীয় আইন যেটি ব্রিটিশদের অধীনস্থ ৪২টি দেশে করা হয়৷ এটি একটি পায়ুকাম নিষিদ্ধ বিষয়ক আইন। যেটাতে স্বামী-স্ত্রীর যোনি-শিশ্নের মিলন ব্যতীত সকল প্রকার যৌন-কর্মকে অস্বাভাবিক এবং প্রকৃতি বিরুদ্ধ বলা হয়। যদি কেউ প্রকৃতির আদেশের বিরুদ্ধে গিয়ে কোন পুরুষ বা নারী বা কোন প্রাণীর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয় তাকে ১০ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে এবং এই মেয়াদ আজীবন পর্যন্ত বর্ধিত করা হতে পারে। যদিও এই আইনটি ব্রিটেনে ১৯৬৭ সালে বাতিল করা হয় কিন্তু বাংলাদেশে এই আইনটি এখনও বলবৎ রয়েছে।
৩৭৭ ধারা প্রয়োগের মাধ্যমে সমকামীদের সাংবিধানিক অধিকার হরণ করে নেয়া হয়েছে। জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ, পেশা,লিঙ্গ ভেদে সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা যেখানে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব, সেখানে যৌনপ্রবৃত্তিগত সংখ্যালঘু সমকামীদের অধিকার প্রদান ত দূরে থাক তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি পর্যন্ত নেই। কোনো নাগরিক যেন সমকামী হিসেবে নিজেদের প্রকাশ করতে না পারে সেজন্য সমকামিতাকে অপরাধ বলে গণ্য করে শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছে এই রাষ্ট্রযন্ত্র।
এত গেলো রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন।
এবার দেখা যাক ধর্ম সমকামীদের জন্য কি বিধান দিয়ে রেখেছে।
সমকামীদের প্রতি ধর্মীয় বিধানঃ
ইসলামে সমকাম বা homosexuality সম্পূর্ণ অবৈধ বা হারাম। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে হযরত লুত (আ.) এর কওমকে (Sodom আর Gomorrah নগরী) আল্লাহ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন যেসব কারণে এর মধ্যে সমকামিতা ছিল অন্যতম। আল কুরআনে সমকামীতাকে নিকৃষ্টতম পাপাচার ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। “এবং আমি লূতকে প্রেরণ করেছি। যখন তিনি স্বীয় সম্প্রদায়কে বললেন, তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বের কেউ করেনি ? তোমরা তো কামবশতঃ পুরুষদের কাছে গমন কর নারীদেরকে ছেড়ে। বরং তোমরা সীমা অতিক্রম করেছ।” (আরাফ ৭:৮১-৮২)
“সারা জাহানের মানুষের মধ্যে তোমরাই কি পুরূষদের সাথে কুকর্ম কর? এবং তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্য সঙ্গিনী হিসেবে যাদের সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে বর্জন কর? বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।”(শুয়ারা২৬:১৬৫-১৬৬)
হাদিসে রাসুল (সা.) এ সমকাম অপরাধ বিষয়টি খুবই সুষ্পষ্ট। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যাদেরকে তোমরা লুতের সম্প্রদায়ের কাজে (সমকামে) লিপ্ত দেখবে তাদের উভয়কেই হত্যা করো।’ (তিরমিজি: ৪/৫৭; আবু দাউদ: ৪/২৬৯; ইবনে মাজা: ২/৮৫৬)।
হিন্দু ধর্মেও সমকামিতা অপরাধ।
মনুস্মৃতি হচ্ছে হিন্দু ধর্মের আইনশাস্ত্র।
মনুসংহিতার অষ্টম অধ্যায়ের ৩৬৯ এবং ৩৭০ নম্বর ছত্রে দু’জন নারীর মধ্যে সমকামিতা সংঘটিত হলে কি শাস্তি হবে তার উল্লেখ আছে। যদি দুই কুমারীর মধ্যে সমকামিতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তাহলে তাদের শাস্তি ছিলো দুইশত মূদ্রা জরিমানা এবং দশটি বেত্রাঘাত (Manu Smriti chapter 8, verse 369.)
যদি কোন বয়স্কা নারী অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নারীর (কুমারীর)সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে বয়স্কা নারীর মস্তক মুন্ডন করে দুটি আঙ্গুল কেটে গাধার পিঠে চড়িয়ে ঘোরানো হবে’ (Manu Smriti chapter 8, verse 370.)।
দু’জন পুরুষ অপ্রাকৃতিক কার্যে প্রবৃত্ত হলে তাদেরকে জাতিচ্যুত করা হবে এবং জামা পরে তাকে জলে ডুব দিতে হবে (Manu Smriti Chapter11, Verse 175.)।
বৌদ্ধধর্মেও সমকামীতাকে বৈধতা দেয়া হয়নি। ত্রিপিটকের ভাষ্যমতে, অতীত কর্মের কারণেই জন্মগতভাবে তাদের সমকামীতার মানসিকতা সৃষ্টি হয় (মহাবর্গ অ.১০৫)।
এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী হচ্ছে, হরমোন ও জিনগত কারণেই জন্মগতভাবে এরকম মানসিকতা তৈরি হয়। যদিও কেন হরমোন ও জিনগুলো সেরকম অস্বাভাবিক আচরণ করে, বিজ্ঞান তার কোনো উত্তর দিতে পারে না। অথচ বৌদ্ধধর্ম সেটার কারণও নির্দেশ করে দিয়েছে এই বলে, সেটা হচ্ছে তাদের পূর্বকৃত কর্মের ফল।
খ্রীষ্টধর্মেও বলা হয়েছে, সমকামীরতা এক ধরনের পাপ
(আদিপুস্তক-১৯:১-১৩; লেবীয়-১৮:২২; রোমীয়-১;২৬-২৭; ১ করিন্থীয়-৬:৯) রোমীয় ১:২৬-২৭
পদ সুনিদিষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, ঈশ্বরের অবাধ্য হওয়া এবং তাকে অস্বীকার করার ফল স্বরূপ সমকামীদের শাস্তি দেয়া হয়েছে। লোকেরা যখন অবিশ্বাস করা শুরু করে যার কারণে পাপ করতেই থাকে, তখন ঈশ্বর ‘লজ্জাপূর্ণ কামনার হাতে’ তাদের ছেড়ে দেন যেন তারা আরও জঘন্য পাপে ডুবে যায় এবং ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে থাকার ফলে নিষ্ফল ও নৈরাশ্যের জীবন অনুভব করতে পারে। ১ করিন্থীয় ৬:৯ পদে বলা হয়েছে, যারা সমকামীতায় দোষী তারা ঈশ্বরের রাজ্যের অধিকার পাবে না। বাইবেলে বলা হয়েছে, লোকেরা পাপের কারণে সমকামী হয় (রোমীয়-১:২৪-২৭)।
উপরোক্ত ধর্মীয় বিধানগুলো পড়লে বুঝতে পারা যায় যে ধর্মের কাছে সমকামীরা সব চাইতে চীর শত্রু। ঈশ্বর নাকি সকল প্রাণীর জন্য সমান, এই পৃথিবীর সকল কিছুই নাকি ঈশ্বরের নির্দেশেই পরিচালিত হয়। তাহলে সেই কথিত ঈশ্বর এরকম বিরূপ বিধান কেন দিয়ে রেখছে সমকামীদের জন্য। একজন মানুষ তো আর ইচ্ছে করে সমকামী হয় না। প্রকৃতির নিয়মানুসারেই তার এই সমকামীতা প্রকাশ পায়। আমরা যদি একজন নারীর কথা চিন্তা করি তাহলে দেখবো একটা মেয়ের স্বাভাবিক ভাবে একটা নির্দিষ্ট বয়সে আসার পর সে মাসিকের সম্মুখীন হয়। এবং সে এই বিষয়টা বোধগম্য হতে শুরু করে যে এটা একটা নারীর প্রাকৃতিক বিষয়। যার কারণে সে এটার সাথে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ঠিক একই একজন সমকামীও একটি নির্দিষ্ট বয়সে পদার্পণ করলে সে বুঝতে পারে যে সে একজন সমকামী। ধর্মীয় ঐসব গ্রন্থগুলোতে সমকামীদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার বিধান পর্যন্ত দিয়ে রেখেছে।
আর এই সব ধর্মীয় গোঁড়া,উন্মাত্ত, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বিধি-নিষেধ এবং অনুশাসনের জের ধরেই ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল কলাবাগানের লেক সার্কাসে ইউএসএআইইডির কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান যিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র সমকামীদের পত্রিকা রুপবানের প্রতিষ্ঠাতা এবং তার বন্ধু এবং এলজিবিটি সহকর্মী নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বি তনয়কে কোন অপরাধ না করেই আনসার আল ইসলাম এবং আল-কায়েদার সাথে সংযুক্ত বাংলাদেশের একটি জঙ্গী গ্রুপের কিছু জঙ্গীদের হাতে নিজ বাসায় ছুরিকাঘাতের আক্রমনে খুন হতে হয়৷
জুলহাজ মান্নান এবং মাহবুব রাব্বি তনয়ের একমাত্র অপরাধ ছিল শুধু একটাই যে তারা সমকামীদের অধিকার নিয়ে বাংলাদেশে কাজ শুরু করেছিলেন। জুলহাজ মান্নান এবং মাহবুব রাব্বি তনয় হত্যার পর বাংলাদেশে সমকামী আর তাদের নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার কর্মীরা অনেকটাই নিভৃতে চলে গিয়েছিলেন।
সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম, পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা এবং নানা ধরনের নির্যাতন-নিপীড়নের কবলে পড়ে আমাদের দেশের এই প্রান্তিক যৌনপ্রবৃত্তিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীটি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে৷
এখন রাষ্ট্রের আইন ব্যবস্থাই সুরক্ষা দেয়ার পরিবর্তে এই গোষ্ঠীর মুখাপেক্ষী হয়ে দাঁড়ায় তখন এদের আর যাওয়ার জায়গা কোথায় থাকতে পারে।
আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই সমকামিতাকে একটি অপ্রাকৃতিক মানসিক বিকারগ্রস্ত প্রবৃত্তি এবং সামাজিক এবং মানসিক ব্যাধি বলে মনে করে। কিন্তু বিশ্বের অনেক মনোবিজ্ঞানী এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানী সমকামীদের সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা দিতে না পারলেও একটি নির্দিষ্ট মতামতে পৌঁছেছেন যে সমকামিতা কোন অপ্রাকৃতিক কিংবা মানসিক ব্যাধি না। বরংচ এটি সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের মতোই একটি স্বাভাবিক যৌন প্রবৃত্তি।
যেমনটা বিষমকামীদের যৌন আকর্ষণ থাকে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি ঠিক তেমনই সমকামীদেরও যৌন আকর্ষণ থাকে সমলিঙ্গের মানুষদের প্রতি। বিশ্বের মধ্যে অনেক বিজ্ঞানীর সমকামীদের নিয়ে গবেষণার ফলাফলে এটাও উঠে এসেছে যে পৃথিবীতে অনেক প্রাণীর মধ্যেও সমকামিতার লক্ষণ রয়েছে।
সমকামিতা কোন অপ্রাকৃতিক বিষয়বস্তু না। যেটা আপনার কাছে প্রাকৃতিক বিষয় মনে হচ্ছে মানে নারী পুরুষ বা বিপরীত লিঙ্গের মানুষদের মধ্যকার যৌন মিলন সেটা সমকামী মানুষদের কাছে অপ্রাকৃতিক বিষয় মনে হয়। আর আপনাদের কাছে যেটা অপ্রাকৃতিক বিষয় মনে হয় মানে সমলিঙ্গের মধ্যকার যৌন মিলন সেটা সমকামীদের কাছে প্রাকৃতিক বিষয়।
ধরুন একজন ক্রিকেট খেলোয়াড় যিনি ছোটবেলা থেকেই বামহাতে খেলতে খেলতে বড় হয়েছেন তাকে চাইলেও আপনি ডান হাতে ফেরাতে পারবেন না৷ আর যদি জোর করে তাকে বাম হাত থেকে ডান হাতে খেলার জন্য ফেরাতে চান তাহলে হয়তবা হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। হয়তোবা সে ক্রিকেট খেলার প্রতি আগ্রহই হারিয়ে ফেলতে পারে নতুবা তার খেলার পারফরম্যান্স নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কারণ তার বামহাতি হয়ে ওঠা টা ছিল পুরোটাই প্রাকৃতিক ব্যাপার।
ঠিক একইভাবে আপনিও যদি একজন সমকামী ব্যক্তিকে জোরপূর্বক বিপরীতকামী করতে যান তাহলে সে হয় আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে না হয় সে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে যাবে। একজন বিপরীতকামী ব্যক্তি যেমন কখনোই একজন সমকামী ব্যক্তির প্রতি আকর্ষণবোধ করে না ঠিক তেমনি একজন সমকামী ব্যক্তিও কখনই কোন বিপরীতকামী ব্যক্তির প্রতি আকর্ষণ বোধ করে না। একজন বিপরীতকামী ব্যক্তিকে যেমন কখনোই জোর করে সমকামিতায় আনা সম্ভব না, ঠিক একইভাবে কোন সমকামী ব্যক্তিকেও জোর করে বিপরীতকামীতায় আনা অসম্ভব না। আর এটাকেই প্রাকৃতিক যৌনাভিমুখ বলা হয়।
বর্তমানে মানুষ আস্তে আস্তে সমকামীদের অধিকার নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেছে। যারাই সমকামিতা নিয়ে একটু লেখাপড়া করার চেষ্টা করেছেন বা সমকামীতা নিয়ে জানার চেষ্টা করেছেন তারাই সমকামিতাকে প্রকাশ্যে সমর্থন না করলেও কৌশলে আঁড়ালে গিয়ে হলেও সমকামীদের অধিকারের বিষয় নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
সম্প্রতি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে সমকামিতার বৈধতার পক্ষে রায় দিয়েছেন। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা থেকে সমকামের অপরাধকে মুক্ত করে দেন৷ শুধু তাই নয় শীর্ষ আদালতের রায় অনুযায়ী সমকামিতা কোন মানসিক ব্যাধি নয় ; এমনকি সমকাম অপ্রাকৃতিক কোনো অপরাধ নয়৷ এই রায়ে শীর্ষ আদালত মনে করে যে এলজিবিটি এর কাছে ইতিহাস ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে থাকবে এবং ব্যক্তিগত পরিসরে সহমতের ভিত্তিতে সমলিঙ্গের যৌন সম্পর্ক ক্ষতিকর নয় এবং সামাজিকভাবে সংক্রামকও নয়। আমরাও আশাবাদী বাংলাদেশেও একদিন ৩৭৭ ধারার অবসান ঘটবে। বাংলাদেশেও উড়বে রংধনুর সাত রঙের পতাকা। যে পতাকার সাতটি রংয়ের শুভ্রতায় ঘুচে যাবে সকল অন্ধত্ব, সকল বাধা। সমকামীরা তাদের অনুভূতির প্রকাশ ঘটাবে স্বাধীনভাবে এমন দিনের প্রত্যাশায় আছি।
Written by Mark Fino



Post a Comment